প্রকাশঃ Sat, Mar 2, 2019 2:42 PM
আপডেটঃ Mon, Dec 2, 2019 2:08 PM


নির্বাচন নিয়ে গণশুনানিতে কী হয়েছে

অনলাইন ডেস্ক

নির্বাচন নিয়ে গণশুনানিতে কী হয়েছে

গত ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আয়োজিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গণশুনানিতে আমি উপস্থিত হই একটু দেরিতে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এদিন গণশুনানির আয়োজন করেছিল গত নির্বাচনে তাদের প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা জানানোর জন্য। সেখানে আমি যাওয়ার পরপরই বক্তব্য দেন সিলেট থেকে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করা রেজা কিবরিয়া। তারপর মঞ্চে একে একে আসেন আওয়ামী লীগের একসময়ের এমপি এস এম আকরাম, ইকবাল সিদ্দিকী, রুমানা মাহমুদ, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, কুড়ি সিদ্দিকী প্রমুখ। কাকতালীয় কি না জানি না, এঁরা সবাই একসময়ে আওয়ামী লীগে ছিলেন কোনো না কোনোভাবে। পরে বক্তব্য দেওয়া অধিকাংশই অবশ্য ছিলেন আগাগোড়া বিএনপি–দলীয় প্রার্থী।

গণশুনানিতে রেজা কিবরিয়া জানান, তিনি প্রচারকাজ চালানোর সুযোগই পাননি ঠিকমতো। একবার মিটিং শেষে তাঁর নিজ বাসায় ঢুকে পুলিশ তাঁর কর্মীদের গ্রেপ্তার করেছে আট বছরের আগের মামলায়। তাঁর কোনো কোনো কর্মী এক-দেড় মাস আগে থেকে হাওর এলাকায় লুকিয়ে থেকেছেন গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য। এমনও ঘটেছে যে পুলিশ তাঁর এক কর্মীকে গ্রেপ্তার করতে এসে না পেয়ে তাঁর ১৬ বছরের ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুসারে, নির্বাচনের রাতে তাঁর কাছে ২০–৩০টি ফোন আসে, বলা হয়, ভোট তখনই হয়ে গেছে। তাঁর পোলিং এজেন্টকে ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। একটি কেন্দ্রে সকাল ৭টা থেকে ভোটাররা লাইন ধরেছেন, পরে মাত্র ৮–১০ জনকে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। পোলিং এজেন্ট তাঁদের সঙ্গে ঢুকেছেন। ঢুকে দেখেন যে ৫টি ব্যালট বাক্সই ভর্তি।

গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন প্রায় দেড় শ প্রার্থী। যাঁরা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবারই একই ধরনের অভিযোগ ছিল।

সেদিনের গণশুনানিতে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে মঞ্চে বসার সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা সাতজন। প্রত্যেককেই দেখেছি গণশুনানির অভিযোগগুলোর নোট নিতে। সেখানে পেশ করা অভিযোগগুলোর কিছু উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এ রকম।

প্রচারে বাধা

নারায়ণগঞ্জের এস এম আকরাম বলেন, তাঁদের সভাই করতে দেওয়া হতো না। ২১ ডিসেম্বর জনসভার জন্য বহু জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করে তিনি ২০ তারিখ রাত ১টায় লিখিত অনুমতি পেয়েছেন। ডেকোরেটর ও মাইকিং করার জন্য নারায়ণগঞ্জে একটা লোককে পাননি তিনি। সকালে মুন্সিগঞ্জ থেকে মাইক এনে ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে জনসভা করতে হয়েছে। ইকবাল সিদ্দিকী (গাজীপুর) বলেন, স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলে পর্যন্ত বাধা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলেছে আচরণবিধির লঙ্ঘন। অথচ অন্য দল প্রতিদিন মিছিল করেছে। যশোরের অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হতো, প্রচারের গাড়ি ভাঙচুর হতো, হামলা হতো তাঁর ওপরেও। কয়েক দফা গ্রেপ্তারের পর তাঁর পাশে ২৫ তারিখের পর কোনো মানুষ ছিল না, ছিলেন শুধু সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা।

গ্রেপ্তার–আতঙ্ক

কিশোরগঞ্জ আসনে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ফজলুর রহমান অভিযোগ করেন যে পুলিশ ও পুলিশের পোশাকে ছাত্রলীগের প্রতিদিনের অভিযানে তাঁর এলাকার ৯টি ইউনিয়ন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গ্রেপ্তার ও হামলা থেকে বাঁচতে তাঁর এলাকার ‘মানুষ বিলে, হাওরে, খেতে’ ঘুমিয়েছে। তাঁর এলাকায় গণগ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন, এমনকি দিনমজুর বা রিকশাচালকেরা, অনেকের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে মাদকের মামলা। থানার কর্মকর্তারা পোলিং এজেন্টদের তালিকা নিয়ে বাসায় হাজির হতেন। একজনকে না পেয়ে তাঁর স্ত্রীকে অশালীন হুমকি দেওয়া হয়।  

পুলিশের দাপট

আবুল হোসেন খান (বাগেরহাট) বলেন, ২৪ ডিসেম্বরের পর পুলিশের আক্রমণ তীব্রতর হয়। পুলিশ হামলা করে, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে। বলে, ইলেকশন করবে পুলিশ। কুষ্টিয়ার আহসান হাবীব লিংকন বলেন, তিনি অভিযোগ জানাতে গেলে নির্বাচন কমিশনের একজন পরিচিত কর্মকর্তা বলেন, কিছু করার নেই, নির্বাচন কমিশন এখন পুলিশের আন্ডারে। পিরোজপুরের ড. মুস্তাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন বিজিবির বিরুদ্ধেও। সেনাবাহিনী নামার পর পুলিশের নিপীড়ন বাড়ার অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, পুলিশ বলত সেনাবাহিনী এসেছে পুলিশের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য।

নিপীড়নের তীব্রতা

সিরাজগঞ্জে নির্বাচন করা রুমানা মাহমুদ বলেন, সন্ধ্যার পর তাঁর একটি প্রচারণা সভায় পুলিশের পোশাক ও কালো হেলমেট পরা লোকজন এসে এলোপাতাড়ি গুলি করে, গুলি তাঁর একজন কর্মী মেরীর দুই চোখে লাগলে মেরী পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। গণশুনানিতে উপস্থিত মেরী বলেন, ‘পুলিশ আসার পর থেকেছি, ভেবেছি গ্রেপ্তার করবে, গুলি করবে কল্পনা করতে পারিনি। আমার দুই চোখ গেছে, সন্তানদের দেখতে পাই না, সেটা দুঃখ না, সবচেয়ে বড় দুঃখ ভোট দিতে পারিনি।’ ছাত্রলীগের একসময়ের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, একটি মিছিলে গুলি আর বোমা শুরু হলে তিনি সামনে গিয়ে হাত তুলে থামানোর চেষ্টা করেন, তাঁকে তখন পেছন থেকে কোপানো হয়।

কয়েক দফা কারচুপি

অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে রাতেই জাল ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার সংবাদ তাঁরা পেয়েছেন, কেউ কেউ জেনেছেন এমনকি সন্ধ্যর পরপরই। কিন্তু প্রশাসনকে জানিয়ে কোনো লাভ হয়নি। আমসা আমিন (কুড়িগ্রাম) বলেন, রাতে কারচুপি হয়েছে, সকালে যখন দেখল বিপুলসংখ্যক লোক ভোট দিতে এসেছেন, তখন আবার কারচুপি করা হয়।

অবিশ্বাস্য ভোট

এমন অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন। যেমন চট্টগ্রামের শাহাদত হোসেন বলেছেন, তিনি তাঁর নিজেরই এলাকার কেন্দ্রে পেয়েছেন ৮ ভোট, প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৮০০ ভোট। তাঁর মতে, ভোট আবার গণনা করলে একটাও মিলবে না।

এ ছাড়া কয়েকজন প্রার্থী বলেছেন, তাঁরা পোস্টার লাগালেও তা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, প্রতিটি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দিলেও তাঁদের বের করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণকারী কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। কয়েকজন বলেছেন, তাঁদের নিজেদেরই বাসায় অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ বা আওয়ামী লীগের লোকজন। শামা ওবায়েদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ তাঁর এলাকায় নৌকার পক্ষেও ভোট চায়নি, শুধু বিএনপি আর সাধারণ ভোটারদের হুমকি দিয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগে সম্পূরক চার্জশিটে গ্রেপ্তার হওয়া খায়রুল কবীর বলেছেন কারারুদ্ধ অবস্থায় প্রতিদিনই নতুন নতুন কর্মী জেলে ঢোকার কথা, সেখানে তাঁদের মানবেতর জীবনের কথা।

কিছু বক্তব্য কানে লেগে ছিল অনেকক্ষণ। যেমন তরুণ প্রার্থী কুড়ি সিদ্দিকী বলেন, ‘এত প্রকাশ্যে সবকিছু হয়েছে যে আমাদের আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাতে হবে না ভোট কীভাবে চুরি হয়েছে।’ বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেছেন, ‘এই নির্বাচন রাষ্ট্রকে এমনভাবে আঘাত করেছে, এমন ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যা সহজে সারবে না।’

৩.এতক্ষণ যা লিখেছি, তা গণশুনানির অভিযোগ। এসব যাচাই করার ক্ষমতা বা উদ্দেশ্য সেখানকার কারোর ছিল না। তবে এসব অভিযোগ
কোনো বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয় বলে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। সেখানে উপস্থাপিত গুরুতর অভিযোগগুলো (যেমন নির্বাচনের আগের রাতেই ভোট হওয়া, মিছিলে ও প্রচারে পুলিশ কিংবা আওয়ামী লীগের কর্মীদের বাধা, গায়েবি মামলায় নির্বিচার গ্রেপ্তার, পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে বাধাদান বা কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রথমে ঢুকতে দিলেও পরে বের করে দেওয়া ইত্যাদি) টিআইবির একটি মানসম্মত পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছিল। বাম দলগুলোর গণশুনানিতে উত্থাপিত এবং ইমরান সরকার ও হিরো আলমের মতো আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগও ছিল
একই ধরনের।

আমরা অনেকে হয়তো লক্ষ করিনি, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কোনো কোনো শরিক দলও ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করেছিল। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু), শরীফ নূরুল আম্বিয়ার জাসদ অভিযোগ করেছিল ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন নিয়ে। পরে অনুষ্ঠিত
গাইবান্ধার একটি আসনে নির্বাচনে গুরুতর কারচুপির অভিযোগ করেছিল আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী জাসদ (ইনু)।

গণশুনানিতে ‘গণঘুমানি’ হয়েছে বলে হাস্য–রসিকতায় মেতে উঠেছেন সরকারের একজন মন্ত্রীও। আমি তাঁদের বলব, ছয় ঘণ্টা গণশুনানির একটি–দুটি মুহূর্তের ওতপাতা ছবি নিয়ে মেতে না উঠে বরং সেখানে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর গুরুত্ব অনুধাবনে তাঁদের সচেষ্ট হওয়া উচিত।

এত গুরুতর, শোচনীয় এবং ব্যাপক অভিযোগ বাংলাদেশে আগের কোনো সংসদ নির্বাচন নিয়ে উত্থাপিত হয়েছে কি? এমন একটি নির্বাচন সমাজে কী ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে, তার কিছু আলামত আমরা এখনই সিটি করপোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনে দেখতে পাচ্ছি


ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি,
ট্যাগঃ নির্বাচন নিয়ে গণশুনানিতে কী হয়েছে
বিভাগঃ ঢাকা
ঢাকা মেট্রো নিউজ


আরো পড়ুন