প্রকাশঃ Sun, Feb 16, 2020 2:41 PM
আপডেটঃ Wed, Feb 19, 2020 1:17 AM


সেই ছেলেটিই এখন রকেট বিজ্ঞানী

অনলাইন ডেস্ক

 সেই ছেলেটিই এখন রকেট বিজ্ঞানী

হাসান সাদ ইফতির শৈশব কেটেছে ঘর আর হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে। সমবয়সীরা যখন বাইরে খেলতে যেত, তিনি তখন জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন। স্বপ্ন দেখতেন রকেট বানিয়ে আকাশে উড়বেন। শারীরিক অসুস্থতা জয় করে উচ্চমাধ্যমিকের পর ইফতি পাড়ি জমান জার্মানিতে—স্বপ্নের বিষয় উড়ান প্রকৌশলে পড়তে। তিনি এখন হাইপারসনিকস বিষয়ে পিএইচডি করছেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছেলেবেলার স্বপ্নটা এখনো অটুট—তাঁর বানানো রকেট ঘুরে বেড়াবে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। পড়ুন হাসান সাদ ইফতির বাধা পেরিয়ে রকেট বিজ্ঞানী হওয়ার কাহিনি।

সবাই ধরে নিল, হাসান সাদ ইফতি নামের ছেলেটি আর বেঁচে নেই। খুলে ফেলা হলো কৃত্রিম শ্বাস–প্রশ্বাসের সংযোগ। অচেতন ছেলে আর চিকিৎসকদের অসহায় মুখ দেখে মুষড়ে পড়লেন মা সেলিনা সুলতানা। কেবল বাবা লুৎফুল হাসান আশা ছাড়লেন না। চিকিৎসকদের অনুরোধ করলেন শেষবারের মতো চেষ্টা করতে। একটা মিরাকল ঘটে গেল। যমের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা হলো ইফতিকে। প্রায় ২০ বছর কেটে গেছে। যাঁর জীবনটাই প্রায় উড়ে গিয়েছিল, সেই ইফতি এখন উড়ান প্রকৌশলী। আরও সহজ ভাষায় রকেট বিজ্ঞানী।

সহজ ভাষায় বললেও ‘রকেট সায়েন্স’ যে বেশ কঠিন, তা কে না জানে। ঠিক ওই রকেট সায়েন্সের মতোই কঠিন ছিল ইফতির শৈশব। এই বাক্যে তিনি হয়তো দ্বিমত করবেন। তাঁর কাছে রকেট সায়েন্স আদতে অতটা কঠিন নয়। এ প্রসঙ্গে তাঁর ব্যাখ্যাটি আমরা নিশ্চয়ই জানব। তার আগে শৈশবের কথাই বলি। ছেলেবেলার কথা মায়ের চেয়ে আর কে ভালো বলবেন? তাই আমরা কথা বলেছিলাম সেলিনা সুলতানার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘ওই মিরাকল ঘটে যাওয়ার পরও হাঁপানি রোগটি ইফতির পিছু ছাড়েনি। একবার অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। প্রখ্যাত শিশুবিশেষজ্ঞ এম আর খানের কাছে ছুটে গেলাম আমরা। তিনি একটি ইনজেকশন দেওয়ার কথা বলেন। জানালেন, এতে ওর জীবন–মরণের সম্ভাবনা–শঙ্কা ফিফটি ফিফটি। ইনজেকশন দেওয়া হলো। টানা ১৫ ঘণ্টা ইফতি আমার কোলে শুয়ে থাকল। অবশেষে চিকিৎসক বললেন, ওকে এখন বিছানায় দিতে পারেন, শঙ্কা কেটে গেছে।’

 

জানালায় শৈশব

ইফতি এখন আছেন যুক্তরাজ্যে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন উড়ান প্রকৌশল বিষয়ে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি ফোন, ই–মেইল ও মেসেঞ্জারে। তাঁর উচ্চারণ ও শব্দচয়নে বোঝার উপায় নেই যে একসময় তিনি ঠিকমতো কথাও বলতে পারতেন না। কেন পারতেন না? ইফতির ব্যাখ্যা, ‘ছেলেবেলায় আমার দিনগুলো কাটত ঘরে কিংবা হাসপাতালে। কথা বলার তেমন কেউ ছিল না। ফলে কথা বলার দক্ষতাটিও ছিল না। এ কারণেই যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম, তখন নতুন করে বাংলাও শিখতে হয়েছিল।’

তবে সেই ঘরবন্দী জীবনেই ইফতি দেখতে থাকেন আকাশে ওড়ার স্বপ্ন। হাসপাতালের দিনগুলোতে বইয়ের পাতায় চোখ রেখে উড়ে যেতেন গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। ইফতির বাবা লুৎফুল হাসান তখন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক। একবার বিদেশ থেকে ফেরার সময় উড়োজাহাজের একটি বই এনে দিয়েছিলেন। ইফতি বলছিলেন, ‘সেই বইয়ে বোয়িং ৭৪৭-এফ, আমেরিকার স্পেস শাটল এবং রুশ স্পেস শাটল বুরানের ছবি ছিল। হাসপাতালের চার দেয়ালে বন্দী সেই ছোট্ট আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন নিজের তৈরি রকেটে ঘুরে দেখব বাইরের জগৎটাকে।’

লুৎফুল হাসান এখন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ছেলের আগ্রহটা টের পেয়েছিলেন কীভাবে? উত্তরে বললেন, ‘আমি সব সময় ছেলেদের সময় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। খুব কাছ থেকে দেখে বুঝেছিলাম, উড়োজাহাজ বিষয়ে ইফতির প্রচণ্ড আগ্রহ। তাই ওকে আমি খেলনা উড়োজাহাজ, বই এনে দিতাম। আমি মনে করি, ছেলেমেয়েদের শুধু ডাক্তার–ইঞ্জিনিয়ার বানানোর চেষ্টা না করে তাদের আগ্রহটা বোঝা জরুরি। বুঝতে পারলে সেই বিষয়ে যতটা পারা যায় সহযোগিতা করলে যে কেউ ভালো করবেই।’

অনুপ্রেরণার শক্তি

চার ভাইয়ের মধ্যে ইফতি দ্বিতীয়। বাবার চাকরিসূত্রে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই বেড়ে উঠেছেন। তাঁর মা লেখাপড়া করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। পরে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য যেতে হয় জাপানে। মা–বাবার সঙ্গে সেখানে বছর তিনেক কাটান ইফতি। জাপানেও বেশির ভাগ সময় হাসপাতালেই থাকতেন। দেশে ফিরেও একই অবস্থা। এর ওপর আরেক সমস্যা হয়ে উঠল প্রতিবেশী। প্রায়ই তাঁরা বাসায় এসে পরামর্শ দিয়ে যেতেন, ‘ওকে দিয়ে পড়াশোনা তো হবে না, একটা মুদির দোকান করে দিন।’ খুব স্বাভাবিকভাবেই দেয়ালের ওপাশ থেকে সব শুনে ভেঙে পড়তেন ইফতি। তাঁর স্বাস্থ্য তখন এতটাই খারাপ ছিল যে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পথেও আবার অসুস্থ হয়ে যেতেন। তাঁর মা-বাবাও আর্থিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন ভীষণভাবে। ফলে প্রতিবেশীদের ‘মূল্যবান’ পরামর্শগুলো ছিল যন্ত্রণার আরেক নাম।

সে সময় ইফতিকে ওসবে কান না দিয়ে সাহস জুগিয়েছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের গণিত শিক্ষক রফিকুল জুয়েল। ইফতি তত দিনে স্কুলে নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরু করেছেন। ফেসবুকে সে সময়ের স্মৃতিচারণা করেছেন এভাবে, ‘নবম শ্রেণির শুরুর দিকে জুয়েল স্যার একদিন আমাকে কাছে ডেকে বললেন, “তুই চেষ্টা কর। তুই অনেক ভালো করবি।” এত নেতিবাচকতার মধ্যে ওই কথাগুলো আমার কাছে ছিল অমূল্য। আমার আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বেড়ে গেল। পড়াশোনায় সময় দিতে শুরু করলাম আরও অনেক বেশি। সেই সঙ্গে মানুষের নেতিবাচক মন্তব্যগুলো অগ্রাহ্য করতে শিখলাম।’

নবম শ্রেণি থেকে ভালো করতে থাকেন ইফতি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ২০০৬ ও ২০০৮ সালে। ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে। সুযোগ হয়েছিল স্থাপত্য বিভাগেও। আরও বড় সুযোগ আসে কদিন পর। ২০০৯ সালের ১৪ তারিখে ভালোবাসার বিষয় উড়ান প্রকৌশলে পড়ার উদ্দেশ্যে ইফতি পাড়ি জমান জার্মানিতে। ভর্তি হন স্টুটগার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে।

পরিশ্রমের ফল

জার্মানিতে প্রথম তিন মাস ভীষণ কষ্ট করতে হয়েছে ইফতিকে। এমনও হয়েছে পরীক্ষার আগের রাতে রেস্তোরাঁয় বসে অঙ্ক করেছেন। কিন্তু তাঁর বাবা একসময় জার্মানিতে ছিলেন। চাইলেই ছেলেকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারতেন। কেন দেননি? লুৎফুল হাসান বলছিলেন, ‘আমি চেয়েছি, ছেলে স্বাবলম্বী হোক। কষ্ট করলে মানুষ আত্মবিশ্বাসী হয়, কোনো বাধাই দমিয়ে রাখতে পারে না।’

ছেলেবেলায় এ রকম একটি আকাশযানে বসার স্বপ্নই তো দেখেছিলেন সাদ। ছবি: সংগৃহীতবাবার দীক্ষায় পরিশ্রম করে ঠিকই ভালো ফল করেন ইফতি। ছেলেবেলা থেকেই ধৈর্যের যে শিক্ষাটি পেয়েছিলেন, সেটিও কাজে লেগে যায় স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসে ইন্টার্ন করার আগে। একবার–দুবার নয়, ৪০ বার আবেদনের পর এয়ারবাস থেকে ডাক আসে। ইফতি বলছিলেন, ‘যখন বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলাম, তখন ভাবতাম, কী করে আরও ভালো করা যায়। জানতাম, এয়ারবাসে ইউরোপীয় না হলে সুযোগ পাওয়া অনেক কঠিন। তাই আমাকে আরও অনেক পরিশ্রম করতে হবে।’

ইফতির মা বলছিলেন, ‘এয়ারবাসে সুযোগ পাওয়ার পর ইফতি আমাকে ফোন করে বলে, “বলো তো মা, আমি কেন সুযোগ পেলাম?” আমি বলি, তুমি যে ভালো ছেলে। ইফতি সত্যিই ভালো ছেলে। সহজ প্রকৃতির মানুষ। ও আমাকে কখনো কষ্ট দেয়নি। আমার অন্য ছেলেরাও একই রকম। আমার বড় ছেলে হাসান সামি আদনান চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবার গবেষক, জার্মানিতে আছে। ইফতি তো দ্বিতীয়। তৃতীয় ছেলে হাসান ইমরান মাসুদ এখন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালেয় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। আর ছোট ছেলে হাসান রিশাদ ইউসুফ আমাদের সঙ্গেই আছে, দশম শ্রেণিতে পড়ছে।’

মহাকাশের স্বপ্ন

এয়ারবাসেও নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন ইফতি। তাঁর গবেষণার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি এখন দিনে কয়েক মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করছে। বিষয়টি তিনি বুঝিয়ে বলেন এভাবে, ‘এয়ারবাসে উড়োজাহাজের সব যন্ত্রাংশ সংযোগ করার পর ফ্লাইট টেস্ট করে এয়ারলাইনসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ সময় কোনো সমস্যা হলে উড়োজাহাজগুলো সময়মতো এয়ারলাইনসের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। ফলে প্রতিদিন ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়; যা কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। আমি হাইড্রোলিক্সের সমস্যার সমাধান দিয়ে একটি প্রক্রিয়া তৈরি করি, যা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান দ্রুত করা যায়।’

তবে এয়ারবাসে এক বছর কাজ করার পর ইফতি বুঝতে পারেন তিনি গবেষণা করতে চান। সুযোগও পেয়ে যান দ্রতই। স্টুটগার্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর একজন জার্মানকে পাঠানো হয় উড়ান প্রকৌশল বিষয়ে গবেষণা করতে। এরই আওতায় ইফতি যুক্তরাষ্ট্রে যান জার্মানির প্রতিনিধি হিসেবে। এর জন্য পান এরিক–বেকার বৃত্তি। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর গবেষণা ছিল সুপারসনিক উড়োজাহাজের ওপর।

২০১৫ সালে অক্সফোর্ডে ভর্তি হন ইফতি। পিএইডি করছেন হাইপারসনিকস নিয়ে। গবেষণা করছেন এমন বিষয় নিয়ে, যা সফল হলে উড়োজাহাজের মতো রকেটেও যাতায়াত করতে পারবে সাধারণ মানুষ। আর ছেলেবেলার স্বপ্নটি তো আছেই, ‘একদিন মানুষ একাধিক গ্রহে ঘুরে বেড়াবে।’ ইফতি বলছিলেন, ‘আমার কাজ হয়তো সেই স্বপ্নকে খুব সামান্য হলেও এগিয়ে নিয়ে যাবে। সকালে উঠে এই উদ্দীপনা নিয়েই প্রতিদিন ল্যাবে যাই আমি।’

তরুণদের কী উদ্দীপনা দেবেন তিনি? ই–মেইলে ইফতির জবাব, ‘তরুণদের বলব, তুমি পারো না, এমন কিছু নেই। সবাই তোমাকে “না” বললেও, নিজেকে কখনো “না” বোলো না।’

ইফতি কেবল পড়াশোনা আর গবেষণাই করেন না, নিয়মিত বই পড়েন, ঘুরতে যান, ছবি আঁকেন, কলম সংগ্রহ করেন, ক্রিকেট খেলেন আর স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিশুদের বিজ্ঞান নিয়ে অনুপ্রেরণা দিতে কথা বলেন। ইফতির কাছে আমরাও বিজ্ঞানের সেই বিষয়টি অর্থাৎ রকেট সায়েন্স সম্পর্কে জানতে চাই—রকেট সায়েন্স কতটা কঠিন? তাঁর জবাব, ‘রকেট সায়েন্স অতটা কঠিন নয়। পরিশ্রম করলে যে কেউ–ই রকেট–বিজ্ঞানী হতে পারে। একটি রকেট বা উড়োজাহাজে বিজ্ঞানের সব কটি বিষয় কাজ করে। তাই জানার পরিধিটা বেশি হতে হয়—এই যা।’

শুনে তো সহজই মনে হয়, তাই না? ইফতির মা তো আর এমনি এমনি বলেননি, ‘রকেট সায়েন্টিস্ট হলেও ছেলেটা সহজ।’

 প্রথম আলো


ক্যাটেগরিঃ শিক্ষা,
ট্যাগঃ সেই ছেলেটিই এখন রকেট বিজ্ঞানী
ঢাকা মেট্রো নিউজ


আরো পড়ুন